বৃহস্পতিবার, ১৫ এপ্রিল ২০২১, ০৯:১৪ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
কালীগঞ্জে মাল্টা চাষে স্বপ্ন বুনছেন নুরুল হক   ‘বৈশাখী মেলা নাই’ করোনায় বসি বসি চলছে হামার দিন হামরা এ্যালা কি করি খাই! করোনায় সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে পুরুষের পাশাপাশি ক্ষেত খামারে শ্রম বিক্রি করছেন নারীরা!  আইতে ঘুমির পাং না, ঘরোত বৃষ্টির পানি দিয়ে গাও বিছনা ভিজি যায় তবু কাউ একনা মোক ঘর দেয় না বাড়ি বাড়ি গিয়ে ম্যাক্স বিতরণ করলেন ৫ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য প্রার্থী জাহিদুল পুলিশ জনগনের সেবক, প্রশংসা করলে ও কাজ করতে হবে,না করলেও কাজ করতে হবে পুলিশ সুপার সবকিছুর ঊর্ধ্বে একজন প্রকৃত ভালো মানুষ হয়ে উঠতে পারাটাই জরুরি -রাকিবুজ্জামান আহমেদ বর্তমান টেকনোলজি আমাদের সুযোগ করে দিয়েছে দূরে থেকেও কাছে থাকার হাতিবান্ধায় আবুল কাশেম সাবু ‘র’ স্মরণে দইখাওয়া আদর্শ কলেজ শোকসভা ও দোয়া মাহফিল আপনি চাইলে আপনার এলাকা থেকে মাদকের শিখর তুলে ফেলতে পারেন ওসি কালীগঞ্জ
বাবা তুমি নেই তাতে কি হয়েছে ? তোমার রোপন করা গাছের ফল খেয়ে অনেকেই তৃপ্তি মেঠাচ্ছে

বাবা তুমি নেই তাতে কি হয়েছে ? তোমার রোপন করা গাছের ফল খেয়ে অনেকেই তৃপ্তি মেঠাচ্ছে

হুমায়ুন কবীর প্রিন্স স্টাফ রিপোর্টার।।

লালমনিরহাট জেলার অত্যন্ত মফস্সলে ও ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত ৯ নং গোতামারী ইউনিয়নের দইখাওয়া গ্রামে এক কৃষক পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন আমার বাবা মোঃ আনছার মিয়া। খুব ছোট বেলায় তিনি তার বাবাকে হারিয়ে মহান আল্লাহর কাছে দুহাত তুলে ফরিয়াদ করেন যেন মা অনেক বছর বেচে থাকেন।

হয়তো আল্লাহপাক শুনেছিলেন মা ভক্ত ছোট অবুঝের আর্তনাদ তাই অনেক বছর তিনি মায়ের সেবা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। সংসারের বন্ধন তাকে আটকাতে পারেনি।

তিনি অবিরত ছুটে চলেছেন ইউনিয়নটির বিভিন্ন উন্নয়নের কর্মসূচিতে। নিজের পরনের শার্ট লুঙ্গি ও স্ত্রীর আলমারির শাড়ি দান করা নেশার পাশাপাশি ঘর ও বাড়ি দান করার মতো কর্মকাণ্ড দেখে এলাকার লোকজন পাগলা নামেই ডাকতে থাকেন।

পরবর্তীতে আনছার মিয়ার চেয়ে “পাগলা” নামেই পরিচিতি পান। ওনার বাবার অঢেল জমিজমার প্রতি তার কোন লালসা ছিলনা আর তাইতো অনেক জমি বিক্রি করে নিজ বাড়ি থেকে হাতীবান্ধা উপজেলার দূরত্ব ১১ কিলোমিটার রাস্তার ২ সাইড (১১×২)= ২২ কিলোমিটার রাস্তায় আম ও কাঁঠালের গাছ লাগান।

নিজ পরিশ্রমে ও পরিচর্যার যাবতীয় ব্যয় নিজে বহন করে গাছ গুলোকে বড় করেন। অথচ তিনি এক গরিব মৃত্যু লোকের অনুষ্ঠানের জন্য গাছের সামান্য কয়টা ডাল কেটেছিল বলে এলাকার কতিপয় অসাধু ব্যক্তির করা মামলায় হয়রানী হতে হয়েছে।

তারপর তিনি ডিলার, মাষ্টার, মেম্বার সহ অন্যান্য কাজ করে অবশেষে চেয়ারম্যানি ইলেকশন করেন। আবারও অসাধু ব্যক্তিদের রোষানলে স্বীকার হয়ে মিথ্যা ঘোষণায় মাত্র ৭ টা ভোটে হেরে যান।

পরবর্তী নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে চেয়ারম্যান হন। তারপর শুরু হল ভিন্ন এক পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়া। নিজ ইউনিয়ন সহ দুরদুরান্তের অন্যান্য ইউনিয়নের গরিব অসহায়রা এসে সাহায্য নিয়ে যেতেন।

আমার জানামতে তিনি শতশত গরিব হিন্দু ও মুসলমান মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। গভীর রাতের অন্ধকারে ইউনিয়নটির চোর গুলোকে গোপনে (যারা পেটের দায়ে কাজ না পেয়ে রাতে চুরি করতেন) ডেকে চুরি না করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে সরকারি অনুদান দিতেন। তারপর শুরু হল লালমনিরহাট জেলার সব ইউনিয়নে পুকুর খননের বাজেট।

তিনি সরকারি বাজেটের বাইরে অতিরিক্ত ব্যয়ের জন্য স্ত্রীর জমি বিক্রি করে টাকা নিয়ে পুকুরটি খনন করে হয়ে যান শ্রেষ্ঠ। জেলা প্রশাসক সব ইউনিয়ন তদন্ত শেষে নিজে এসে গোতামারী হাই স্কুল মাঠে সেরা পুকুর খননের জন্য ৯ নং গোতামারী ইউনিয়ন কে ৯ নং “আদর্শ” গোতামারী ইউনিয়ন বলে ঘোষনা দেন।

হয়তো আজ এগুলো অনেকের কাছে গল্প মনে হবে। তিনি চেয়ারম্যান হয়েও সরকারি টাকা দিয়ে ১ শতক জমি কিনেননি বরং ইউনিয়নটির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিজ বাবার ও স্ত্রীর জমি বিক্রি করে সাহায্য করেছেন। প্রতি পদে পদে বিরোধীরা ও সমাজের কিছু কীটরা হয়রানী করেও ক্ষান্ত হননি।

পরপর নির্বাচনে জয়ী হচ্ছেন বিধায় অবশেষে বিরোধী দলের এক অমানুষ আমাদের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে মেরে ফেলেন ৩ জন নিস্পাপ শিশুকে (আমার বোনকে)।

এছাড়াও তার চলার পথে রাতের অন্ধকারে এক্সিডেন্ট ঘটার জন্য বিরোধীরা প্রায় দিন বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতেন, আর মামলা ছিলো বেহিসেবি। উনি সব নীরবে সয়েছেন আর সঙ্গে ছিল তার মায়ের দোয়া। প্রতিদিন সকালে তিনি তার মাকে সালাম করে দোয়া নিয়ে তারপর বাড়ি থেকে বের হতেন।

এবার আসি রাজনীতিতে।

তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন এবং আওয়ামীলীগ করতেন। যুদ্ধশেষে সার্টিফিকেট হাতে পেয়েও ছিড়ে ফেলেছেন কারণ বরাবরই ওনি প্রতিদান ও প্রতিশোধ কে এড়িয়ে চলতেন। আমি খুব ছোটবেলায় দেখতাম প্রায়দিন সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমান এমপি জনাব মোতাহার হোসেন (বড় আব্বা) আমাদের বাড়িতে আসতেন।

ওনার উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচনে আমার বাবার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। ওনার প্রত্যেক নির্বাচনেই বাবা নিঃস্বার্থ ভাবে অর্থ, পরিশ্রম ও জনবল দিয়ে সহযোগিতা করেছেন অথচ আমার বাবা ২৬ দিন অসুস্থ থেকে মৃত্যু, এবং আজ প্রায় ৫ বছর হয়ে গেছে তবু এমপি মহোদয় একটি বারের জন্য শান্তনা দিতে আসেন নি। অথচ বি এন পির নেতা এডভোকেট রাজিব এসে আমার মাকে শান্তনা দিয়ে গেছেন।

আমার ভাইবোনেরা বিভিন্ন স্কুল কলেজে শিক্ষকতা করতেছেন নিজেদের প্রচেষ্টায়। অথচ বাবা বেচে থাকতে আমার বোনের এস আই পদে সব পরীক্ষায় টিঁকেও চাকরিটা হলনা। সেদিন আমার বাবাকে প্রশ্ন করেছিলাম: বাবা আজ কোথায় তোমার ,,,,,? বাবা কষ্ট ভরা কন্ঠে জবাব দিয়েছিল ” ফোন করেছিলাম রে মা রিসিভ করেনি হয়তো ব্যস্ত ছিলেন” । বাবা আমার এমনি একজন মানুষ যিনি পুরো জীবনটা ট্রাজেডিতে কাটালেন কিন্তু কারো প্রতি তার কোন অভিযোগ নেই।

এবার আসি ডায়রিতে,

বাবার মৃত্যুর কিছুদিন পর তার ডয়ারে কয়েকটি ডায়েরি পাই। ইউনিয়নের অনেক ব্যক্তিদের নিয়ে লেখা। সাবু মামা (বর্তমান চেয়ারম্যান), কাশেম মামা, আব্বাস ডাক্তার (তাওয়াই), নুরইসলাম (নবাব) মামা, পূর্ব পাড়ার মনির সহ আরো কয়েকজন এবং যাঁরা আমার বাবার নিঃস্বার্থ কাজে উৎসাহ যুগিয়েছেন আবার যারা উপহাসে উপেক্ষায় সারাক্ষণ মত্ত ছিলেন তাদের নিয়ে অনেক লেখা।

উপহাস করা ব্যক্তিদের প্রতি অভিযোগ না থাকলেও একটি ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেছেন (যিনি বাবার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে চরম হয়রানীর সাথে খুব মানুষিক কষ্ট দিয়েছেন) তার সাথে যেন আমরা কখনোই আপোস/বিবাদ কোনটাই না করে দূরত্ব রেখে চলি।

বাবা লিখেছেন সাবু অনেক ভাল। তার ভিতরটা পরিষ্কার। বাবার এই কথাটিতে অনুপ্রাণিত হয়েই আমি দুর থেকে সাবু মামার জন্য ভোট কালেক্ট করেছি যা উনি আজো জানেন না তবে রনজু মামা জানেন। বাবা এই ইউনিয়নটির যে কয়েকজন শিক্ষিত বেকারদের চাকরি দিয়েছেন তাদের বেশিরভাগ রা পরবর্তীতে নিমক হারামি করে বাবার ধংশ চেয়েছেন।

শুধুমাত্র গোতামারী হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক রনজু মামা এখন পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বাবা আমরা চিনি আমাদের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়া সেই বেঈমানদের, বাবা আমরা চিনি তোমাকে মিথ্যে মামলায় হয়রানী করা সেই নিমকহারামি দের, বাবা আমরা তোমার কল্যাণকর কাজের বিরোধীদের এখনো চোখের সামনে প্রতিনিয়ত দেখছি কিন্তু তুমি যে আদর্শ শিখিয়েছ “ক্ষমাই মহত্ব” তাই মন না চাইলেও তাদেরকে আজো সম্মান করে যাচ্ছি।

বাবা আওয়ামীলীগ করতেন অথচ তৎকালিন বিএনপির নেতা ও জ্বালানি বিষয়ক মন্ত্রী ডঃ খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রত্যেক ঈদে বাবাকে ঈদ কার্ড পাঠাতেন এবং বাড়ি পুড়ে যাওয়ার সংবাদ টিভিতে দেখা মাত্রই ঢাকা থেকে ছুটে এসেছিলেন এই মফস্সলে আমাদের কঠিন মুহুর্তে আমাদের বাড়িতে।

হয়তো তিনি বেচে থাকলে আব্বার অনুপস্থিতিতে আজো শান্তনা ও দিতে আসতেন। আমার পরিবারের কার কি বক্তব্য জানিনা তবে আমার বক্তব্য হল: আমি একজন বঙ্গবন্ধুর জন্য, একজন ক্ষমতাশালী নেত্রী হাসিনার জন্য আওয়ামীলীগ করি। অন্য কারো জন্য নয়।

অতঃপর গোতামারী ইউনিয়ন থেকে আনছার মিয়া পাগলা নামের নক্ষত্রটির মৃত্যু হল বটে কিন্তু তিনি বেচে আছেন থাকবেন তার কর্মে। বাবা তুমি আজ নেই কিন্তু তাতে কি ? তুমি অনন্তকাল বেচে থাকবে। তোমার সহযোগিতায় গড়ে তোলা আনছারিয়া মাদ্রাসাটার অস্তিত্বে। বাবা তুমি নেই তাতে কি? বহু দেরি হলেও সরকার তোমাকে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের সম্মান দিয়েছেন।

বাবা তুমি নেই তাতে কি? দেশের গ্রামাঞ্চলের সর্বোচ্চ শহীদ মিনারটি যে তুমি তৈরি করেছ তা একটি বেসরকারি টেলিভিশনে প্রকাশ করেছে। বাবা তুমি নেই তাতে কি? লালমনিরহাটের বড়বাড়িতে স্থানীয়দের উদ্যোগে ছাপানো (লালমনিরহাট জেলাকে নিয়ে লেখা) বইটিতে তোমার মহান কর্মকাণ্ডকে নিয়ে কলাম আছে।

বাবা তুমি নেই তাতে কি? তোমার রোপন করা গাছের ফল খেয়ে এখনও মানুষ সহ পশুপাখি তৃপ্তি মেঠাচ্ছে, এখনও তোমার গাছ গুলোর ছায়ায় পথচারীরা ক্লান্তির অবসান ঘটান। এখনো মসজিদ মাদ্রাসা নির্মাণে তোমার রেখে যাওয়া গাছ বিক্রি করে কাজে লাগানো হচ্ছে, এখনও মৃত্যু ব্যক্তির অনুষ্ঠানে তোমার গাছের ডাল কেটে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, এখনও গৃহপালিত জীবদের খাদ্য হিসেবে তোমার এই গাছের পাতা ব্যবহার করছে। বাবা আজ খুব অভাব তোমার মতো একজন পাগল মানুষের।

আছেন কেউ এই ইউনিয়নটির সাহসী ব্যক্তি যিনি নিজের জমি বিক্রি করে একজন পাগলা চেয়ারম্যানের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া গাছের স্থানে আর একটি গাছ রোপন করে এই মহান উদ্যোগটার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখবেন? বাবা আমারো অনেক ইচ্ছে হয় তোমার কল্যাণকর কাজের শূন্যস্থান টি আমি পূরণ করি, ইচ্ছে হয় মৃত্যুর পর তোমার মতই কর্মে বেচে থাকতে। বাবা আল্লাহপাক তোমাকে বেহেস্ত নসীব করুক আমীন।

( তোমার ৬০ বছর জীবদ্দশায় অধ্যায়ের মহান কর্মকাণ্ড গুলোর অনেক কিছুই লেখার বাকি থেকে গেল)

লেখক আকতারী জামান

শেয়ার করুন:

সংবাদ টি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভাষা পরিবর্তন করুন




© All rights reserved © 2018 লালমনিরহাট অনলাইন নিউজ
Design BY PopularHostBD